কর্মময় জীবনে সোভিয়েত নারীর অগ্রগতি

কর্মময় জীবনে সোভিয়েত নারীর অগ্রগতিপুনম শাহরীয়ার ঋতু, স্টাফ রিপোর্টার: প্রথম দিকে নারী শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি ছিল নিরক্ষর। কিন্তু পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছরেই ১৯৩০ সালে তা কমে গেল আশাতীতভাবে। ১০০ জনের মধ্যে ৮৪.২ ভাগ মেয়ে লেখাপড়ায় পারদর্শী হয়ে উঠল। দলে দলে বিভিন্ন শিল্প-শিক্ষালয়ে গিয়ে ভর্তি হলো তারা। সাধারণ শ্রমিক হয়ে থাকলে চলবে না। দেশের খাতিরে, তাদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক শিল্প-শিক্ষায় সুদক্ষ হয়ে উঠতে হবে। ফলস্বরূপ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দিনগুলিতে দেখা গেল লক্ষ লক্ষ নারী কলকারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের নানা ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রত। ১৯৩৭ সালের হিসাব থেকে দেখা যায় যে ৯৪ লক্ষ নারী সোভিয়েট দেশের নানা কাজে-কর্মে নিযুক্ত আছে। ১৯৩৫ সালের একটি হিসাবে মেয়েদের কাজের সংখ্যাগুলি পাওয়া যায়। বড় বড় কলকারখানায় নারীর সংখ্যা ২৬ লক্ষ ২৭ হাজার, নির্মাণকাজে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার, যানবহনে ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার, বাণিজ্য ও সাধারণ ভোজনাগারে ৮ লক্ষ ২২ হাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রপরিচালনায় ১৯ লক্ষ ৭৮ হাজার এবং কৃষিকাজে ৬ লক্ষ ৮৫ হাজার নারী নিযুক্ত ছিল। ১৯৩৩-৩৪ সালে মেয়েরা মাঠে মাঠে ট্রাক্টর, কমবাইন চালাতে শুরু করেছে। এমনকি ১৯৩৪ সালে একদল মেয়ে ট্রাক্টর — চালক একদল পুরুষদেরকে কাজে হারিয়ে দেয় এবং পরে সেই পুরুষরা মেয়েদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করে। ১৯৩৫ সালে কম্বাইন পিছু ৪০০-৪৫০ একর জমি চাষ করা যেত। সে জায়গায় আমেরিকায় একজন চাষী ৫৫৭.৫ একর জমি তৈরি করতে পারত। ১৯৩৫ সালেই সোভিয়েতের বীর মেয়েরা আমেরিকার রেকর্ড ভঙ্গ করে ১৩৬০ একর জমি প্রস্ততি করেছে। ১৯৩৮ সালের একটা হিসাব থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যায় সোভিয়েত সমাজে মেয়েরা কত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে- বড় বড় শ্রমশিল্পে ৩৯.৮% নারী, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ৩৪%, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩.১, চিকিৎসা-শাস্ত্রে ৫০.৬% , শিক্ষাজগতে ৬৪.৮%। পৃথিবীর মধ্যে সর্বপ্রথম নারী রাষ্ট্রদূত হলেন একজন রুশ নারী, ম্যাদাম কোলনতাই। সর্বোচ্চ শাসন পরিষদের সভাপতির মধ্যে দুজন হলেন সভানেত্রী। ১৯৪০ সালের তথ্য থেকে জানা যায়, সে সময়ে যৌথ খামারের সভানেত্রী-সহসভানেত্রীর সংখ্যা হল ১৪ হাজার ২শত এবং খামারের প্রাণীপালন বিভাগের প্রধান পরিচালিকার সংখ্যা হলো ৪০ হাজার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতায় সোভিয়েত নারী জারের আমলে ৭০% লোক এক অক্ষর লিখতে পড়তে জানত না। গ্রামের কৃষক মেয়ে ও কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে শিক্ষার অবস্থা ছিল আরো করুণ। ১৯২০ সালে মোট জনসংখ্যার ৬৭% ছিল অশিক্ষিত। মেয়েদের ক্ষেত্রে ছিল ৭৫% । ১৯২৯ সালে ৫৮% মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৩২ সালের মধ্যে ৯০% মানুষ অক্ষর চিনতে শিখল, নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসতে শিখল। মাত্র ১২ বছরের মধ্যে অশিক্ষিত জনসংখ্যার ৬০% কে শিক্ষিত করে তোলা হল যা ছিল বিস্ময়কর। শিশু-শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে, যৌথখামারে, শহরে জনসংখ্যার প্রয়োজন অনুসারে হাজার হাজার ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে। কোথাও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি কেন্দ্র, কোথাও শ্রমিক সংঘ ক্লাব, অবার কোথাও যৌথ খামার ক্লাব। একই সাথে সজ্জিত পাঠাগার ছিল। এখানে এসে সকলে মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনা করত। নিজেদের দেশের নাান খবর, দেশ-বিদেশের খবর, জ্ঞানবিজ্ঞানের খবর আহরণ করে পারস্পরিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করত। একই সাথে বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হত। এই চক্রগুলি সোভিয়েত সংস্কৃতির জগতে গুরুত্বপূণৃ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৩৩ সালের হিসাব থেকে দেখা যায় মোট চক্র সভ্য ছিল ২১ লক্ষ ৭৯ হাজার, তার মধ্যে মেয়েরা ছিল ৯৭ হাজার। এ তথ্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে সৃজনীশক্তি, কল্পনাশক্তি ও বৃদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে চক্রের মেয়েরা পুরুষদের প্রায় সমান সমান ছিল। উল্লেখিত কর্মসূচি নারীকে নতুন জীবন দিয়েছিল। দুনিয়ার সামনে নারীসমাজ ও নারী আন্দোলন নতুনভাবে গড়ে উঠেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি অধিকারসম্পন্ন শিক্ষিত সুস্থ মানুষ হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত মুসলিম প্রজাতন্ত্রের মেয়েরা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বৈষয়িক ও মানসিক উভয় দিক থেকে সবচেয়ে স্বাধীন ও অগ্রসর নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। (আইজাজ, ১৯৯৩)

Leave a Reply